মালিহা পারভীন।।
ইদানিং রাতে ঘন ঘন জলের তেষ্টা পায় সুবিনয়ের। মাথার কাছে টেবিলে রাখা বোতল থেকে ও জল ঢালতে যেয়ে দেখে বোতলটা খালি।
বিছানা থেকে নেমে সুবিনয় দরজার দিকে এগোয়।
: সুবিনয়, দিলে তো আমার ঘুমটা ভেংগে!
অবন্তীর বিরক্ত গলা। অবন্তী, ওর স্ত্রী। অল্পতেই ওর ঘুম ভেংগে যায়। সুবিনয় সাবধানে দরজা ভিজিয়ে ও ডাইনিং স্পেসে আসে। ফ্রিজ খুলে ঠান্ডা পানির বোতল বের করে। আলো জ্বালিয়ে চেয়ারটা টেনে নেয়।
ঘরের সিলিঙে ঝাড়বাতির ফুল লতার রহস্যময় ছায়া ফ্যানের সাথে দুলছে। নিজের ঘরটাকে এভাবে কখনো দেখা হয় নি। তিন বছর হলো সুবিনয় ও অবন্তীর সংসার। চারুকলা থেকে পাশ করা অবন্তী মনের মত ক’রে সংসারটা সাজিয়েছে। কচু পাতা রঙ দেয়াল। জানালায় সাদা পর্দা । ওদের যুগল ছবি দেয়াল জুড়ে। অবন্তীর একক একটা ছবিও আছে। লাল সাদা শাড়িতে অবন্তীকে প্রতিমার মত লাগছে।
ঘরের এক কোণে লোহার আধুনিক ডিজাইনের স্ট্যান্ড। এর নীচের তাকে সবুজ পাতার টব, ক্যাকটাস রাখা আছে। আর একদম উপরের তাকে পারিবারিক সুত্রে পাওয়া সবুজ ল্যান্ডফোনটি । নষ্ট এই যন্ত্রটাকে অবন্তী কেন যে এতো যত্ন করে এখানে সাজিয়ে রেখেছে কে জানে!
ফোনটা দেখলেই সুবিনয়ের সুমিতার কথা মনে পরে। সুমিতা ওর প্রথম প্রেম। ক্রস কানেশন থেকে ওদের পরিচয়, গল্প ও অবশেষে গভীর প্রেম। কত রাত ওরা এই ফোনে কথা বলেছে! কথা বলতে বলতে হাত ব্যাথা হয়ে গেছে, ভোর হয়ে গেছে।
সুমিতার কথা মনে হতেই সুবিনয়ের কপালে ঘাম জমতে শুরু করেছে। আরেক গ্লাস জল ও গলায় ঢেলে উঠে দাঁড়ায়। দেয়াল ঘড়িতে তখন রাত তিনটা বাজার দশ মিনিট বাকি।
ফেব্রুয়ারি শেষ না হ’তেই এবার ভ্যাপ্সা গরম পরা শুরু করেছে। সুবিনয় জানালার পর্দা সরিয়ে দাঁড়ায়। ঝিরঝিরে হাওয়া এসে চোখে মুখে লাগে। আকাশে মস্ত চাঁদ। আজ কি ফাল্গুনী পুর্ণিমা ! বাড়ির সামনের রাস্তাটা একদম স্তব্ধ, সুনসান। ওদের এই বাড়িটা একটু শহরতলীর দিকে। এমনিতেই এদিকে কোলাহল কম। তার উপর এখন করোনা মহামারির লক ডাউন চলছে। কেমন ভুতুরে থমথমে পরিবেশ!
তখনই সুবিনয় দেখে এক তরুণী নীল শাড়ি পরে রাস্তাটায় হেঁটে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। এতো রাতে কে এই মেয়ে ! কৌতুহল নিয়ে তাকায় সুবিনয়। মেয়েটা তখনই ফিরে তাকায় । একি, এ যে ওর সুমিতা ! সুমিতার মুখে কেমন বাঁকা হাসি।
সুবিনয়ের মাথা কেমন শুন্য শুন্য লাগে। কোনোরকমে শোবার ঘরে এসে শুয়ে পরে। অবন্তী শব্দ পেয়ে পাশ ফিরে শোয়। সুবিনয় আজ চোখ বন্ধ করতে ভয় পাচ্ছে । আবার বুঝি সুমিতাকে দেখে! সিলিংগের দিকে ফ্যানের ঘোরা দেখতে থাকে।
সুমিতা মারা যাবার পর আজ নিয়ে দুদিন হলো সুবিনয় দেখলো ওকে। বিয়ের পরপর সুবিনয় আর অবন্তী কুয়াকাটা বেড়াতে গিয়েছিল। রাস পুর্ণিমার রাত । সমূদ্র পাড়ে একটা ছাতার নীচে চেয়ারে ওরা বসেছিল । তখনই সুবিনয় দেখলো নীল শাড়ি পরা সুমিতা হেঁটে যাচ্ছে ওদের সামনে দিয়ে ঠিক আজকের মতই। তারপর হঠাৎ নাই হয়ে গেল। ওই রাতে হোটেলে ফিরে সুবিনয়ের প্রচন্ড জ্বর হয়েছিলো।
আজও ওর জ্বর জ্বর লাগছে। মস্তিস্কে হুল ফোঁটাতে শুরু করেছে দুঃসহ সেই স্মৃতি। তখন সুবিনয়ের দাথে সুমিতার সাথে গভীর প্রেম চলছে। লক্ষী পুজার রাত। ধবল জোছনায় ভেসে যাচ্ছে চারিদিক। সুমিতাদের বাড়ীর ছাদে চুপিচুপি দেখা করেছিল সেদিন ওরা। কত কথা ! কথা বলতে বলতে সামান্য কথা কাটাকাটি। সুবিনয়ের মুহুর্তেই কি জানি কি হলো। ছাদের কার্ণিশে হেলান দেয়া সুমিতাকে ও আচমকা ধাক্কা দিল। তারপর! বাড়ির সামনের রাস্তায় সুমিতার থেতলে যাওয়া মাথা। হলুদ মগজ ঠেলে বের হয়ে আসছে। চাঁদের আলোয় গলিত মগজ চিকচিক করে জ্বলছে।
কিভাবে যে সেদিন সুবিনয় সুমিতাদেরবাড়ির ছয় তলার ছাদ থেকে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এসেছিল তা আজ মনে নেই। পরদিন খবরের কাগজে সুমিতার আত্মহত্যার খবর ছাপা হয়েছিল। সি সি ক্যামেরার যুগ ছিল না বলে সে যাত্রা সুবিনয় রক্ষা পেয়ে গিয়েছিল। আর সময়ে এটাকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে সুবিনয় ধীরে ধীরে ওর মস্তিস্কে সুমিতার মৃত্যুকে মেনে নিতে থাকে।
আজ আর বাকি রাত ঘুম হবে না মনে হচ্ছে। সকালে উঠার তাগাদা নেই। লক ডাউনে অফিস বন্ধ। কোভিড আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলছে। চারিদিকে হাহাকার। অসুস্থতা আর বেকারত্বের অনিশ্চয়তা। সুবিনয়ের অবশ্য তেমন সমস্যা হচ্ছে না। সরকারি চাকরি। অবন্তী ইউ টিউব দেখে নতুন নতুন রান্না করছে। সুবিনয় খাচ্ছে, ঘুমাচ্ছে। তবে ইদানীং অবন্তীর সাথে ওর একটুতেই খিটিমিটি লেগে যাচ্ছে। সুবিনয় ছাদ বাগানের কাজ, টিভি, ফেসবুকিং নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেস্টা করে।
আজকাল সুবিনয়ের মধ্যে পুরানো সেই অস্বাভাবিকতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে প্রায়ই। যেমন ওর ইচ্ছে করে অবন্তীকে ছাদ থেকে ফেলে দেয়। কখনো ইচ্ছে করে গ্যাসের চুলায় ঠেসে ধরে। ছোটবেলায় সুবিনয় একবার ওর ছোট ভাইকে রাস্তা পার হবার সময় রিক্সার নিচে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল। আজকাল অফিসেও এমন হয়। ইচ্ছে করে টেবিলে রাখা পেপার ওয়েট তাক করে কারো মাথায় ছুঁড়ে দেয়।
সুবিনয় একজন সাইকিয়াট্রিস্টের সাথে কথা বলার কথা ভাবে। কিন্তু একটা ভয় কাজ করে। যদি সুমিতাকে ছাদ থেকে ধাক্কা দেয়ার ব্যাপারটা বের হয়ে আসে !
সুবিনয় আবার ঘামছে। ছোট্র লাল বাতিটা জানান দিচ্ছে ঘরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রন যন্ত্র চলছে ঠিকমতন। ল্যান্ড ফোনটা বেজে ওঠে। একবার, দুবার, কয়েকবার। এতো রাতে! সুবিনয় অবাক হয় । আর ওটাতো অকেজো। অবন্তী কি তাহলে বিল মিটিয়ে এটাকে আবার চালু করেছে!
সুবিনয় উঠে ফোনের দিকে এগোয়। বার কয়েক ‘হ্যালো হ্যালো’ করে রিসিভার রেখে দেয়। নাহ, কোনো সাড়া শব্দ নেই।
: এ সময় তুমি কাকে ফোন করছো ? তোমার মোবাইলে কি চার্জ নেই? অবন্তীর গলা। ও কখন এসে সুবিনয়ের পাশে দাঁড়িয়েছে তা টেরই পায়নি।
: না, মনে হলো ফোনটা বাজছে। তাই এলাম ধরতে। আসলে কেন যেন ঘুম আসছিল না। সুবিনয়ের ক্লান্ত গলা।
অবন্তী স্বামীর কপালে হাত দেয়। নাহ, শরীর ঠান্ডা। হাত টেনে বলে –
: একটু ছাদে ঘুরে আসবে? চল।
সুবিনয় কোনো কথা না বলে বাধ্য ছেলের মতন অবন্তীর পিছু নেয়। সিঁড়ি ভেংগে ওরা ছাদে আসে। ওদের ছোট ছাদ কিন্তু বেশ গোছানো। একধারে সবজি লাগানোর জায়গা, অন্য পাশে অর্কিড। বাকি জায়গা জুড়ে নানান ফুলের গাছ। ছাদে আসতেই হালকা ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা এসে লাগে। প্রান ভরে শ্বাস নেয় সুবিনয়।
বাতাসে কামিনী ফুলের গন্ধ। আকাশে শেষ রাতের ক্লান্ত চাঁদ। সুবিনয় অনেকদিন পর অবন্তীর হাত দুটো ওর হাতের মুঠোয় তুলে নেয়। ফিসিফিস ক’রে বলে –
: আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ অবু । তুমি আমার এলোমেলো জীবনটাকে পুর্ণ করেছো।
অবন্তী অবাক হয় ‘তোমার হলো কি আজ! ‘
আবার ভালও লাগে। কতদিন পর সুবিনয় আজ ওর সাথে এমন সুরে কথা বলছে!!
অবন্তী সুবিনয়ের উত্তরের অপেক্ষা না করে রেলিংগে হেলান দিয়ে গুনগুন করে -‘ চাঁদের হাসি বাঁধ ভেংগেছে –,’
সেই সুর নিস্তব্ধতার অণুতে মিশে যেতে থাকে। অদ্ভুত মাদকতার আবেশ ছড়িয়ে দেয়। সুবিনয় মুগ্ধ হয়ে দেখে অবন্তীকে ।
হঠাৎ কেন সুবিনয়ের কাছে অবন্তীকে এ মুহুর্তে সুমিতার মতন লাগছে ! ওর অস্বস্তি হতে থাকে। মাথার কোথাও তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে। জেগে উঠছে ভয়ংকর ইচ্ছে। চাঁদে থেকে কেন রক্ত ঝরছে সমস্ত পৃথিবী প্লাবিত করে।
তার কিছুক্ষন পরই অবন্তীর তীব্র চিৎকারে জেগে উঠে শেষ রাতের স্তব্ধ লোকালয়।
Leave a Reply